Header Ads

Header ADS

সারা জীবন জেলখানাতে কাটাবো, তবু শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে থাকবো না’


খুলনা ।।  শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে নির্যাতনে নিহত তিন জনের একজন খুলনার পারভেজ হাসান রাব্বি (১৬)। মৃত্যুর সাত দিন আগে ফোনে রাব্বি তার বাবাকে বলেছিলো, ‘এখানে আর থাকতে চাই না, জন্মনিবন্ধন সংশোধন করে প্রাপ্তবয়স্ক দেখিয়ে এখান থেকে বের করে নিয়ে যাও। সারা জীবন জেলখানাতে থাকবো, তবু শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে থাকবো না।’


বাবা রোকা মিয়া যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র থেকে ছেলে রাব্বিকে সরিয়ে নিতে জন্মনিবন্ধন সংশোধনেরও চেষ্টা করেন। রোকা মিয়া সন্তানকে দ্রুত সরিয়ে নিতে তৎপরও ছিলেন। কিন্তু সফল হওয়ার আগেই ছেলের মৃত্যু হলো। ছেলেকে একটু অপেক্ষা করতে বলেছিলেন তিনি। অপেক্ষার শেষ হল বাড়িতে রাব্বির নিথর দেহ আসার মধ্য দিয়ে।

রাব্বির মৃত্যুতে খুলনার দৌলতপুর থানার পশ্চিম সেনপাড়া এলাকায় শোক বিহ্বল পরিবেশ বিরাজ করছে। পরিবারের একমাত্র ছেলে সন্তানকে হারিয়ে মা পারভীন বেগম এখন ভারসাম্যহীন।


দৌলতপুরের পাশ্চিম সেনপাড়ার বাসিন্দা খুলনা বিভাগীয় ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা মো. রোকা মিয়ার একমাত্র ছেলে মো. পারভেজ হাসান রাব্বি বন্ধু মহলের বিরোধে গত বছরের ৩১ আগস্ট একই এলাকার মোস্তফা ফরাজীর ছেলে মো. জনী ফরাজীকে (১৮) হত্যা মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি হয়। জনি ফরাজী হত্যার ঘটনায় তার পিতা মোস্তফা ফরাজী বাদী হয়ে দৌলতপুর থানায় হত্যা মামলা করেন (মামলা নম্বর-১৮, তারিখ-৩১/৮/১৯)। মামলায় পারভেজ হাসান রাব্বি, মো. জনি ও মো. মামুনুর রশিদ লিমনকে আসামি করা হয়। আসামিরা অপ্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ায় আদালতের মাধ্যমে তাদেরকে ৮-৯ মাস আগে যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানো হয়। পারভেজ হাসান রাব্বি মাঝে মধ্যে পরিবারকে যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের অনিয়মের চিত্র জানাতো। খাওয়া দাওয়াসহ বিভিন্ন অনিয়মের বিষয়ে অবহিত করতো। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার সকালে রাব্বি তার বাবাকে ফোন করে সেখানে সমস্যা হচ্ছে বলে জানায় এবং তাকে সরিয়ে আনার জন্য বলে।

রোকা মিয়া বলেন, ‘রাব্বি ফোনে জানিয়েছিলো ওখানে ঠিকমতো খেতে দেয় না, খাবার চাইলে নির্যাতন করা হয়। গত দুই সপ্তাহ আগে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে খাবার নিয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে রাব্বিসহ কয়েকজন বন্দির কথা কাটাকটি হয়েছে। এখানকার কর্মকর্তাদের মদতপুষ্ট কিছু বন্দি একজোট হয়ে তাদেরকে বিভিন্নভাবে নির্যাতন করছে। রাব্বি আরও বলেছিলো ওখানের যাদের ফোন দিয়ে কথা বলে, তারা পাশে দাঁড়িয়ে থাকার কারণে সব কথা বলা যায় না, আর কোনও কিছু বললে তারা পরে শাস্তি দেয়। তাই, রাব্বি যশোর কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে থাকতে চায়নি। ওখান থেকে যে কোনোভাবেই হোক তাকে বের করে আনার জন্য আকুতি জানিয়েছিলো।’

নিহত রাব্বির স্বজনদের আহাজারি

রোকা মিয়া বলেন, ‘আমি ছেলেকে বলেছিলাম অপ্রাপ্ত বয়স্ক কিশোররা ওখানেই থাকে। রাব্বি বলে বাবা আমি আর অপ্রাপ্ত বয়স্ক থাকতে চাই না, আমার জন্মনিবন্ধন সংশোধন করে আমাকে নিয়ে যাও। সারা জীবন জেলখানাতে থাকবো, তবু এখানে থাকবো না।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি আমার ছেলের লাশ আনতে গিয়ে আহত বন্দিসহ অনেকের কাছে নির্মম নির্যাতনের কথা শুনেছি। ২-৩ দিন ধরে না খাওয়া আমার ছেলেসহ কিশোর বন্দিদেরকে প্রতিষ্ঠানের কিছু কর্মকর্তা, কর্মচারী ও তাদের মদতপুষ্ট বন্দি মিলে অডিটোরিয়ামের সিড়ি ঘরের নিচে নিয়ে গ্রিলের সঙ্গে হ্যান্ডকাপ দিয়ে বেধে মুখে গামছা ঢুকিয়ে লোহার রড, ক্রিকেটের স্ট্যাম্প, পাইপ, কাঠের ও বাঁশের লাঠি দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে এলোপাতাড়ি মারপিট করে। মুমূর্ষু অবস্থায় তাদেরকে চিকিৎসা না করে অডিটোরিয়ামের মেঝেতে ফেলে রাখে। পানি চাইলেও তাদেরকে পানি দেওয়া হয়নি। পরবর্তীতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লে আমার ছেলেসহ আহতদেরকে হাসপাতালে নেয়, কিন্তু তার আগে আমার ছেলে রাব্বিসহ নাঈম হোসেন ও রাসেল ওরফে সুজন মারা যায়।’

শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে থাকা একই এলাকার মো. আলমগীরের পুত্র মো. জনী গুরুতর আহত অবস্থায় যশোর সদর হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে। শনিবার নিহত রাব্বির লাশের সব আইনি প্রক্রিয়া শেষে দুপুর ১২টায় মানিকতলা খাদ্য গুদাম সংলগ্ন মসজিদের সামনে জানাজা শেষে মহেশ্বরপাশা কবরস্থানে দাফন করা হয়।


এদিকে নিহত রাব্বির দৌলতপুর থানার পশ্চিম সেনপাড়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সেখানে চলছে শোকের মাতম। পরিবারের একমাত্র ছেলে সন্তানকে হারিয়ে মা পারভীন বেগম মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। নিরাপত্তা বেষ্টনির মধ্যে থেকে নির্মমভাবে এমন মৃত্যু যেন পরিবারসহ এলাকাবাসী কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না। এলাকাবাসী এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তপূর্বক অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।


সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন 

No comments

Powered by Blogger.